— মং হ্লা প্রু পিন্টু
বাংলাদেশ একটি
বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দেশ। এ দেশের বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে রাখাইন
সম্প্রদায় অন্যতম। মূলত কক্সবাজার, পটুয়াখালি, বরগুনা এবং বৃহত্তর পার্বত্য
চট্টগ্রাম অঞ্চলে রাখাইনদের বসবাস। যেকোনো জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল
ভিত্তি হল তার মাতৃভাষা এবং নিজস্ব সংস্কৃতি। তবে বিশ্বায়ন, আধুনিক শিক্ষার প্রভাব
এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে রাখাইন শিশুদের মাঝে মাতৃভাষাচর্চা ও
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুশীল দিন-দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
এই সংকট উত্তরণে
বাংলাদেশে রাখাইন শিশুদের মাতৃভাষা (রাখাইন ভাষা) শিক্ষাদান এবং রাখাইন সাংস্কৃতিক
উন্নয়নে তিনটি প্রধান পক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। পক্ষগুলো
হল— সরকারি প্রতিষ্ঠান ‘কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ‘রাখাইন
বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ এবং ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক
কেন্দ্র হিসাবে বিভিন্ন ‘রাখাইন বৌদ্ধবিহারের বিহারাধ্যক্ষ (বৌদ্ধভিক্ষু)’।
নীচে এই তিন অংশীজনের
বর্তমান ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে একটি বিস্তারিত রূপরেখা প্রস্তাবনা আকারে
তুলে ধরছি:
১. ‘কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’
(প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা): ‘কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ মূলত সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ একটি প্রতিষ্ঠান, যা
স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে কাজ করে। রাখাইন
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে এই কেন্দ্রের ভূমিকা অপরিসীম।
▶️ বর্তমান ভূমিকা:
* বিভিন্ন জাতীয় ও
সাংস্কৃতিক দিবসে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী নৃত্য, গান ও নাটক মঞ্চায়নের সুযোগ তৈরি
করা।
* রাখাইন সংস্কৃতির
উপাদানগুলো সংরক্ষণের জন্য সীমিত পরিসরে হলেও গবেষণা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা।
▶️ ভবিষ্যৎ করণীয় ও
সুপারিশ:
* ভাষা শিক্ষা কোর্স
চালু: কেন্দ্রটিতে নিয়মিতভাবে রাখাইন শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ‘রাখাইন ভাষা শিক্ষা
কোর্স’ চালু করা উচিত।
* পাঠ্যপুস্তক ও উপকরণ
তৈরি: ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)’
বৃহত্তম পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রাক্-প্রাথমিক ও
প্রাথমিক স্তরে একাধিক আদিবাসী অর্থাৎ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষায় বই প্রণয়ন করলেও
অনেক সময় তা মাঠপর্যায়ে পৌঁছায় না। এক্ষেত্রে ‘কক্সবাজার
সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ রাখাইন শিশুদের জন্য নিজস্ব উদ্যোগে বর্ণমালাসহ
সহজপাঠ্য ব্যাকরণ, শিশুতোষ গল্প ও ছড়ার বই প্রকাশ করতে পারে।
* ডিজিটাল আর্কাইভ ও
ভাষা ল্যাব: রাখাইন ভাষার সঠিক উচ্চারণ, ঐতিহ্যবাহী গান ও রূপকথা সংরক্ষণের জন্য
একটি ডিজিটাল অডিয়ো-ভিডিয়ো আর্কাইভ এবং ভাষা ল্যাব (Language Lab)
স্থাপন করা প্রয়োজন।
* সাংস্কৃতিক উৎসব ও
বৃত্তি: বার্ষিক রাখাইন সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিধি বাড়ানো এবং রাখাইন ভাষা ও
সংস্কৃতিচর্চায় মেধার স্বাক্ষর রাখা শিশুদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করা।
২. ‘রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ (সামাজিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্ব): ‘রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’ রাখাইন সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়, সমাজ সংস্কার ও ঐতিহ্য রক্ষায়
প্রতিনিধিত্বকারী সামাজিক সংগঠন। যেকোনো সামাজিক আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হল
সাংগঠনিক তৎপরতা।
▶️ বর্তমান ভূমিকা:
* রাখাইন সমাজের অধিকার
রক্ষা এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধা যেন প্রান্তিক রাখাইনদের কাছে পৌঁছায়, সে বিষয়ে
লবিং করা।
* সামাজিক ও ধর্মীয়
উৎসবগুলো সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্প্রদায়ের ঐক্য বজায় রাখা।
▶️ ভবিষ্যৎ করণীয় ও
সুপারিশ:
* তৃণমূল পর্যায়ে নৈশ
বিদ্যালয় পরিচালনা: সংগঠনের উদ্যোগে রাখাইন অধ্যুষিত বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নিয়মিত ‘নৈশ বিদ্যালয়’ বা ‘সাপ্তাহিক ভাষা শিক্ষা ক্লাস’ চালু করা
যেতে পারে, যেখানে শিশুরা বিদ্যালয় ছুটির পর মাতৃভাষা শিখবে।
* স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক
তৈরি: রাখাইন তরুণ-তরুণীদের মধ্য থেকে যারা মাতৃভাষায় দক্ষ, তাদের সংগঠিত করে
স্বেচ্ছাসেবী শিক্ষক হিসাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া।
* সচেতনতা বৃদ্ধি ও
মোটিভেশন: অনেক অভিভাবক আধুনিক শিক্ষার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য শিশুদের
মাতৃভাষা শেখাতে উদাসীন থাকেন। এসোসিয়েশনের উচিত উঠান বৈঠক ও সেমিনারের মাধ্যমে
অভিভাবকদের এমনভাবে সচেতন করা যে— বহুভাষিকতা শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটায়,
নিজের ভাষা ভুলে যাওয়া কিন্তু গৌরবের নয়।
* তহবিল গঠন: রাখাইন
সমাজের বিত্তবানদের সহায়তায় একটি ‘সাংস্কৃতিক উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করা, যা দিয়ে
ভাষার বই প্রকাশ ও শিক্ষকদের সম্মানী দেওয়া সম্ভব হবে।
৩. বৌদ্ধবিহার ও
বিহারাধ্যক্ষ ভিক্ষুবৃন্দ (ধর্মীয় ও নৈতিক পাঠশালা): ঐতিহাসিকভাবে রাখাইন সমাজে বৌদ্ধবিহার বা ‘কিয়ং’/‘কেয়াং’ (Kyong)
কেবল ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, এটি সমাজ ও শিক্ষার মূল কেন্দ্রও
বটে। ঐতিহ্যগতভাবে রাখাইন শিশুরা বিহারে গিয়েই প্রথম অক্ষরজ্ঞান লাভ করত। বর্তমান
যুগেও বিহারাধ্যক্ষ ও বৌদ্ধভিক্ষুদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও প্রভাব অপরিসীম।
▶️ বর্তমান ভূমিকা:
* ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান
ও উৎসবের (যেমন: ‘সাংগ্রেং’ বা বর্ষ বিদায় ও বরণ উৎসব, ‘ওয়াগ্যোয়ে’ বা প্রবারণা উৎসব) মাধ্যমে রাখাইন সংস্কৃতির ধর্মীয় দিকটি বাঁচিয়ে রাখা।
* ‘কাছুঙ লাহ্ব্রে’ বা বুদ্ধপূর্ণিমা এবং
পুরো বর্ষাবাসের বিশেষ-বিশেষ ধর্মীয় তিথিতে বৌদ্ধবিহারে শিশুদের ধর্মীয় ও নৈতিক
শিক্ষা প্রদান।
▶️ ভবিষ্যৎ করণীয় ও
সুপারিশ:
* বিহারভিত্তিক মাতৃভাষা
পাঠশালা (পালি টোলের ন্যায় মাতৃভাষা টোল): প্রাচীন ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করে
প্রতিটি রাখাইন বৌদ্ধবিহারের একটি অংশকে সকাল বা সন্ধ্যায় রাখাইন ভাষা শিক্ষার
পাঠশালা হিসাবে ব্যবহার করা। বিহারাধ্যক্ষরা নিজেরা বা যোগ্য কোনো শিক্ষক দিয়ে এই পাঠশালা
পরিচালনা করতে পারেন।
* ধর্মীয় গ্রন্থের
পাশাপাশি ভাষার উপর জোর: ধর্মীয় সাহিত্যের (ত্রিপিটক ও জাতকের গল্প) পাশাপাশি
রাখাইন ভাষার লিপি (Rakhine
Script)
যেন শিশুরা সঠিকভাবে লিখতে ও পড়তে পারে, তা নিশ্চিত করা।
* সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের
শিক্ষা: রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান, বড়দের সম্মান করা এবং নিজস্ব কৃষ্টির
প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার নৈতিক শিক্ষা বিহার থেকেই শিশুদের দেওয়া উচিত।
* সরকারি ও সামাজিক
উদ্যোগের সাথে সমন্বয়: কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং রাখাইন বুড্ডিস্ট
ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের শিক্ষা কর্মসূচির জন্য বিহারের আঙিনা উন্মুক্ত করে দেওয়া
এবং তাদের কার্যক্রমে আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সমর্থন জোগানো।
✅ সমাপনী ও সমন্বিত
উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা: রাখাইন শিশুদের
মাতৃভাষা শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন কোনো একক পক্ষের দ্বারা শতভাগ সফল করা সম্ভব
নয়। এখানে প্রয়োজন একটি ত্রিমাত্রিক সমন্বিত প্রচেষ্টা (Triple-Layer Collaboration)।
▶️ সমন্বয় কাঠামো:
* ‘কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’ দেবে
রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক লজিস্টিক সাপোর্ট, অর্থায়ন এবং আধুনিক প্রশিক্ষণ।
* ‘রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন’
করবে মাঠপর্যায়ের সামাজিক ও সাংগঠনিক তদারকি এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংগ্রহ।
* বৌদ্ধবিহারের বিহারাধ্যক্ষবৃন্দ
প্রদান করবেন স্থান (ভেন্যু) এবং আধ্যাত্মিক ও নৈতিক অভিভাবকত্ব।
▶️ এই তিন শক্তির মেলবন্ধন
ঘটলে বাংলাদেশের রাখাইন শিশুরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের
হাজার বছরের গৌরবময় ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে একজন আত্মমর্যাদাশীল
নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠতে পারবে। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির
সৌন্দর্য প্রকৃত অর্থে রক্ষিত হবে।
লেখক পরিচিতি: মং হ্লা প্রু পিন্টু; অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ফিচার লেখক ও গবেষক। সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মী।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন