বুধবার, জুলাই ০১, ২০২৬

রাখাইন সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের ভূমিকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাদ্যপ্রশিক্ষণের অপরিহার্যতা

মং হ্লা প্রু পিন্টু

 

যেকোনো সংস্কৃতির আত্মিক ও শৈল্পিক অভিব্যক্তির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হল সংগীত ও নৃত্য। আর সেই সংগীত ও নৃত্যকে প্রাণবন্ত ও রূপময় করে তোলে নিজস্ব ঐতিহ্যের বাদ্যযন্ত্র। বাংলাদেশের কক্সবাজার, পটুয়াখালি, বরগুনা ও বৃহত্তর পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী রাখাইন সম্প্রদায়ের হাজার বছরের যে সাংস্কৃতিক ইতিহাস, তার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হল তাদের ঐতিহ্যবাহী লোকবাদ্যযন্ত্র। রাখাইনদের সামাজিক উৎসব, ধর্মীয় আচার এবং লোকনৃত্যগীতের মঞ্চ— সবখানেই এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর সুর ও ছন্দ এক জাদুকরী আবহ তৈরি করে।

 

তবে আধুনিক বিশ্বায়ন এবং ইলেকট্রনিক মিউজিকের (Digital Music) আগ্রাসনে রাখাইনদের এই নিজস্ব ও আদিম বাদ্যযন্ত্রগুলো আজ চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। নতুন প্রজন্মের রাখাইন শিশু-কিশোর-যুবকদের মাঝে এই বাদ্যযন্ত্রগুলো চেনার এবং তা বাজানোর দক্ষতার অভাব প্রকট হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে রাখাইন সংস্কৃতির সামগ্রিক উন্নয়ন ও সংরক্ষণের জন্য রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রগুলোর পুনরুজ্জীবন এবং এর জন্য নিবিড় ও প্রাতিষ্ঠানিক ‘বাদ্যপ্রশিক্ষণের’ প্রয়োজনীয়তা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

১. রাখাইন সংস্কৃতির অনন্য অনুষঙ্গ (ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের পরিচয়): রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রগুলো তাদের জীবনচর্চা, প্রকৃতি এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এগুলো শুধু সুর তৈরি করে না, বরং রাখাইন জাতির হাজার বছরের ইতিহাস ও আবেগকে বহন করে। নীচে রাখাইন সংস্কৃতির প্রধান কিছু বাদ্যযন্ত্রের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল:

* বুঙ-পেহ্ (Bung-Peh): এটি রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী একধরনের ঢোল বা ড্রাম। রাখাইন সংগীত ও নৃত‌্যের ছন্দের মূল ভিত্তি হল এই বুঙ ও পেহ্। এর গমগমে গম্ভীর আওয়াজ যেকোনো উৎসবের সূচনাকে ঘোষণা করে। বিশেষ করে ঐতিহ্যবাহী রাখাইন নৃত্যের তালের গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হয় বুঙ ও পেহ‌্‌র বোলের উপর ভিত্তি করে।

* হ্নেঃ (Hnae): এটি একজাতীয় বাঁশি বা সানাই গোত্রের বায়ুচালিত বাদ্যযন্ত্র (Wind Instrument)রাখাইন লোকসংগীতের করুণ ও মিষ্টি সুর ফুটিয়ে তুলতে হ্নেঃ-এর ভূমিকা অনন্য। এর সুর শ্রোতাকে এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক ও গ্রামীণ আবহে নিয়ে যায়।

* চেহ্ (Che): এটি মূলত ধাতব বাদ্যযন্ত্র, যা করতাল বা ঝাঁঝরির মতো কাজ করে। সংগীতের তাল ও লয়কে ধরে রাখার জন্য এবং গানের ভেতরের গতিশীলতা বজায় রাখতে চেহ্-এর ব্যবহার অপরিহার্য।

* লাঙখোয়া (Lankhwa): এটিও ধাতব বাদ্যযন্ত্রবিশেষ।

* ওয়াহ‌্ লাখৌ (Bamboo Clapper): এটি বাঁশ দিয়ে তৈরি একধরনের পারকাশন বা তালের বাদ্যযন্ত্র। এক টুকরো বিশেষ বাঁশকে অর্ধেক চিরে (ফালি করে) হাত দিয়ে আঘাত করে খটখট শব্দে ছন্দ তৈরি করা হয়, যা রাখাইন সামাজিক নৃত্যগীতে গ্রামীণ ও লোকজ আবহকে অক্ষুণ্ণ রাখে।

এছাড়া রাখাইনদের আরও কিছু প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র রয়েছে, যা তাদের যেকোনো উৎসব, যেমন— ‘সাংগ্রেং’ (বর্ষ বিদায় ও বরণ উৎসব), ‘ওয়াগ্যোয়ে’ (প্রবারণা উৎসব), কিংবা ঐতিহ্যবাহী ‘জ্যাহ্’ (থিয়েটার বা নাটক)-কে পূর্ণতা দেয়।

 

২. বর্তমান সংকট (সুর হারানোর উপক্রম): বর্তমানে রাখাইন সংস্কৃতির এই সুরের ভুবন এক বড় ধরনের সংকটের মুখোমুখি। এই সংকটের প্রধান কারণগুলো হল:

* প্রবীণ বাদকদের প্রস্থান ও উত্তরসূরির অভাব: যাঁরা এই জটিল বাদ্যযন্ত্রগুলো নিখুঁতভাবে বাজাতে পারতেন, সেই গুণী ও প্রবীণ শিল্পীদের অনেকেই আজ আর বেঁচে নেই। আর যারা বেঁচে আছেন, তাঁরা জরাজীর্ণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে এই বাজানোর কলাকৌশল হস্তান্তরিত হয়নি।

* ডিজিটাল মিউজিকের প্রভাব: আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, কি-বোর্ড বা সিন্থেসাইজারের ব্যবহারের ফলে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রের মূল ব্যবহার ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ট্র্যাডিশনাল সুরের জায়গায় কৃত্রিম মেকানিক্যাল সুর জায়গা করে নিচ্ছে।

* তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের সংকট: বুঙ, পেহ্ বা হ্নেঃ তৈরি করার মতো দক্ষ কারিগর এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। বাদ্যযন্ত্রগুলো নষ্ট হয়ে গেলে তা মেরামত করার সুযোগও কমে আসছে।

 

৩. বাদ্যপ্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব: রাখাইন সংস্কৃতির এই অমূল্য সম্পদকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে কেবল বাদ্যযন্ত্রগুলো মিউজিয়ামে সাজিয়ে রাখলে চলবে না; এগুলোকে মানুষের ঠোঁটে ও হাতে সচল রাখতে হবে। আর এর একমাত্র উপায় হল নিবিড় ও দীর্ঘমেয়াদি বাদ্যপ্রশিক্ষণ। এর গুরুত্ব বহুমুখী:

* সাংস্কৃতিক মৌলিকত্ব রক্ষা: একটি কি-বোর্ড দিয়ে হয়তো রাখাইন গানের সুর তোলা সম্ভব, কিন্তু ‘হ্নেঃ’-এর মাধ্যমে ফুসফুসের হাওয়া থেকে সৃষ্ট আদিম সুর কিংবা ‘ওয়াহ‌্ লাখৌ’-র বাঁশের খাঁটি লোকজ ছন্দ কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অসম্ভব। সংস্কৃতির খাঁটি রূপ বা মৌলিকত্ব (Authenticity) ধরে রাখতে এই প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।

* তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা: রাখাইন তরুণ, কিশোর ও শিশুদের যদি শৈশব থেকেই এই বাদ্যযন্ত্রগুলোর প্রতি আকৃষ্ট করা যায় এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের দক্ষ করে তোলা যায়, তবে তাদের মধ্যে নিজস্ব জাতিগত পরিচয় নিয়ে গর্ব করার মানসিকতা তৈরি হবে। এটি তাদের অপসংস্কৃতির হাত থেকেও রক্ষা করবে।

* পেশাদারিত্ব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি: রাখাইন নৃত্য ও সংগীতের দেশে-বিদেশে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় দক্ষ হয়ে উঠলে তরুণরা একে পেশা হিসাবে গ্রহণ করতে পারবে। বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক উৎসবে তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।

 

৪. বাদ্যপ্রশিক্ষণ বাস্তবায়নে প্রধান অংশীজনদের করণীয়: এই প্রশিক্ষণকে সফল করতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে:

 

ক. কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভূমিকা (সরকারি পর্যায়):

* স্থায়ী প্রশিক্ষণ উইং গঠন: কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রাখাইন ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানোর জন্য একটি বিশেষ ও স্থায়ী ‘বাদ্যপ্রশিক্ষণ উইং’ চালু করতে হবে।

* ভাতা ও কর্মশালা: গ্রামীণ অঞ্চল থেকে খুঁজে-খুঁজে প্রবীণ গুণী বাদকদের এনে মাস্টার ট্রেইনার (প্রধান প্রশিক্ষক) হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের সম্মানজনক ভাতার ব্যবস্থা করতে হবে।

* বাদ্যযন্ত্রের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ: প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বুঙ, পেহ্, চেহ্, হ্নেঃ ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

 

খ. রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের ভূমিকা (সামাজিক পর্যায়):

* শিক্ষার্থী সংগ্রহ ও সচেতনতা: রাখাইন পাড়া-মহল্লায় গিয়ে মা-বাবা ও তরুণদের বোঝাতে হবে যে, নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রের সুর হারিয়ে গেলে রাখাইন জাতির অর্ধেক পরিচয়ই হারিয়ে যাবে। তারা প্রতিটি গ্রাম থেকে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে পাঠাতে পারে।

* প্রতিযোগিতা ও উৎসবের আয়োজন: তরুণ বাদকদের উৎসাহিত করতে প্রতি বছর ‘সেরা বুঙ-পেহ্ বাদক’ বা ‘সেরা হ্নেঃ বাদক’ এমন শিরোনামে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা।

 

গ. বৌদ্ধবিহার ও বিহারাধ্যক্ষদের ভূমিকা (ধর্মীয় পর্যায়):

* মহতী উদ্যোগের স্থান হিসাবে বিহারের ব্যবহার: বৌদ্ধ ধর্মীয় উৎসবগুলোর সাথে রাখাইন সংস্কৃতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। বিহারাধ্যক্ষরা বিহারের আঙিনা বা হলরুমে নৈশকালীন বা ছুটির দিনগুলোয় তরুণদের জন্য এই ঐতিহ্যবাহী বাদ্য বাজানোর প্রাথমিক পাঠের ব্যবস্থা করার অনুমতি দিতে পারেন। বিহারের পবিত্র আবহ কিশোর-যুবকদের শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেবে।

 

▶️ উপসংহার: রাখাইন সংস্কৃতি কেবল রাখাইন সম্প্রদায়ের নয়, এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতিরও এক অমূল্য অলংকার। বুঙ-পেহ্-এর গম্ভীর আওয়াজ, হ্নেঃ-এর সুমধুর তান, লাঙখোয়ার ধাতব শব্দ এবং চেহ্-ওয়াহ্ লাখৌ-এর ছন্দময় খটখট শব্দ এ দেশের মাটিরই সুর। এই সুরগুলোকে স্তব্ধ হতে দেওয়া যাবে না। তাই কালক্ষেপণ না করে কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে, রাখাইন বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সামাজিক নেতৃত্বে এবং বৌদ্ধবিহারের পৃষ্ঠপোষকতায় রাখাইন তরুণদের জন্য একটি ব্যাপকভিত্তিক ‘ঐতিহ্যবাহী বাদ্যপ্রশিক্ষণ’ কর্মসূচি চালু করা অপরিহার্য। হাতের আঙুলে যখন আবার পুরনো বাদ্যযন্ত্রগুলো প্রাণ ফিরে পাবে, তখনই কেবল রাখাইন সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নয়ন এবং টেকসই সংরক্ষণ সম্ভব হবে।

 


লেখক পরিচিতি: মং হ্লা প্রু পিন্টু; অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ফিচার লেখক ও গবেষক। সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মী।

কোন মন্তব্য নেই: