শুক্রবার, আগস্ট ১৪, ২০২৬

জীবনরেখা বাঁকখালি: পার্বত্য চূড়া থেকে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় তিন উপজেলার জনজীবন ও অর্থনীতি

 — মং হ্লা প্রু পিন্টু

দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের পার্বত্য সীমান্ত থেকে উৎপন্ন হয়ে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়া নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী হল বাঁকখালি নদী। ভৌগোলিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই নদীটি কক্সবাজার ও পার্বত্য বান্দরবান অঞ্চলের এক অনন্য প্রাণপ্রবাহ। পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি এবং কক্সবাজার জেলার রামু ও কক্সবাজার সদর উপজেলার বুক চিরে বয়ে চলা প্রায় ৬৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি কেবল একটি জলধারা নয়— এটি এই জনপদের অস্তিত্ব, জীবিকা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির মূল সঞ্চালক।



১. উৎস থেকে মোহনা (বাঁকখালির গতিপথ ও স্পর্শ করা লোকালয়): বাঁকখালি নদীর নামকরণ মূলত এর সর্পিল ও অত্যন্ত বাঁকাবাঁকা গতিপথের কারণে। নদীটির উৎপত্তি থেকে সাগরে পতন পর্যন্ত রূপান্তরটি অত্যন্ত চমৎকার:

 * উৎস ও নাইক্ষ্যংছড়ি অংশ (বান্দরবান): বাঁকখালি নদীর উৎপত্তি বান্দরবান পার্বত্য জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তসংলগ্ন দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চলে। পাহাড়ি ঝরনা ও বিভিন্ন ছোট ছড়া (যেমন- দোছড়ি ও ক্রাং ছড়া) একত্রিত হয়ে এই নদীর জন্ম। নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী ও পার্বত্য উপত্যকার মারমা, চাক, তঞ্চঙ্গ্যা ও বাঙালি অধ্যুষিত পাহাড়ি লোকালয় ছুঁয়ে এটি সমতলের দিকে ধাবিত হয়।

 * রামু অংশ (কক্সবাজার): পাহাড়ের সীমান্ত পার হয়ে নদীটি কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় প্রবেশ করে। রামুতে এসেই নদীটি সুপরিসর রূপ নেয়। এখানে এটি কচ্ছপিয়া, গর্জনিয়া, কাউয়ারখোপ, ফতেখাঁরকুল (রামু সদর), রাজারকুল ও চাকমারকুলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিয়ন ও জনপদ স্পর্শ করে। রামুতেই নদীর আঁকাবাঁকা রূপ সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট।

 * কক্সবাজার সদর অংশ: রামু থেকে পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে বাঁক নিয়ে নদীটি কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রবেশ করে। এটি ঝিলংজা, বাংলাবাজার, পিএমখালি, খুরুশকুল, কস্তুরাঘাট, নাজিরারটেক ও নুনিয়ারছড়াকে স্পর্শ করে কক্সবাজার শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়।

 * বঙ্গোপসাগরে পতন: অবশেষে কক্সবাজার শহরের কস্তুরাঘাট ও নুনিয়ারছড়ার কোল ঘেঁষে নদীটি মহেশখালি চ্যানেলে প্রবেশ করে এবং চূড়ান্তভাবে বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে বিলীন হয়।


২. দুপাড়ের অর্থনৈতিক জীবনে বাঁকখালির প্রভাব: বাঁকখালি নদী নাইক্ষ্যংছড়ি, রামু ও কক্সবাজার সদরের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে:

ক. কৃষি ও খাদ্যোৎপাদন: রামুর কচ্ছপিয়া ও গর্জনিয়া থেকে শুরু করে কক্সবাজার সদরের পিএমখালি পর্যন্ত বাঁকখালির দুই তীরে গড়ে উঠেছে বিস্তীর্ণ পলিমাটির কৃষিক্ষেত্র। নদীটির পানি সেচ হিসাবে ব্যবহার করে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ শীতকালীন শাকসবজি (বেগুন, মূলা, টমেটো, মরিচ, বাঁধাকপি) ও ধান উৎপাদিত হয়। জেলাজুড়ে রামুর যে ‘সবজি ভাণ্ডার’ হিসাবে পরিচিতি, তার মূল চালিকাশক্তি বাঁকখালির সরবরাহ করা পানি ও উর্বর পলি।

খ. মৎস্য সম্পদ ও শুঁটকি শিল্প: নদীর মিঠা পানি ও সাগরের নোনা পানির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা মোহনা অঞ্চলটি মৎস্য সম্পদের এক বিশাল উৎস। বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে আসা শত-শত সামুদ্রিক ট্রলার বাঁকখালি নদীর কস্তুরাঘাট ও নুনিয়ারছড়া পয়েন্টেই তাদের আহৃত মাছ খালাস করে। এ ছাড়া খুরুশকুল ও নাজিরারটেক এলাকায় গড়ে ওঠা এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ শুঁটকি মহালের সম্পূর্ণ পরিবহন ও মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণের পানির উৎস এই বাঁকখালি নদী।

গ. পাহাড়ি পণ্য ও লবণের বাণিজ্য: ঐতিহাসিকভাবেই বাঁকখালি নদী এই অঞ্চলের প্রধান অভ্যন্তরীণ নৌপথ। নাইক্ষ্যংছড়ির দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থেকে সংগৃহীত বাঁশ, কাঠ, রবার, ছন ও মেহগনি গাছের কাঠ ভেলা বানিয়ে বা নৌকায় করে বাঁকখালি হয়ে রামু ও কক্সবাজারের বাজারে আনা হত/হয়। অন্যদিকে, উপকূলীয় এলাকা থেকে আহৃত অপরিশোধিত কাঁচা লবণ নৌপথে প্রক্রিয়াজাতকরণ চাতালে নিয়ে যেতে বাঁকখালি নদীই সবচেয়ে সাশ্রয়ী পথ।



৩. প্রাত্যহিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনধারা: অর্থনীতির বাইরেও নদীর দুপাড়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সাথে বাঁকখালি গভীরভাবে জড়িত:

 * সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: বাঁকখালির দুই তীরে যুগের পর যুগ ধরে বাঙালি, রাখাইন ও বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ সম্প্রীতির সাথে বসবাস করে আসছে। চৈত্র সংক্রান্তিতে বড়ুয়াদের জলকেলি উৎসব কিংবা প্রবারণা পূর্ণিমায় রামুর বাঁকখালি নদীতে রঙিন কল্পজাহাজ ভাসানোর উৎসব এই অঞ্চলের লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন।

 * দৈনন্দিন জীবন ও গৃহস্থালি: নদীর উপকূলবর্তী গ্রামগুলোয় স্নান, কাপড় ধোয়া, গবাদিপশু পালন এবং পারিবারিক কাজের জন্য নদীর পানিই নিত্যদিনের ভরসা।

 * যোগাযোগ ও সেতু কালচার: নদীর উপর গড়ে ওঠা বাংলাবাজারের রবার ড্যাম, শিকলঘাট সেতু, কস্তুরাঘাট সেতু এবং খুরুশকুল সংযোগ সেতু কেবল দুপাড়ের মানুষকে যুক্ত করেনি, বরং আন্তঃউপজেলা যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন গতি এনেছে।


৪. পরিবেশগত সংকট ও বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ: প্রকৃতির এত আশীর্বাদ সত্ত্বেও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে বাঁকখালি নদী বর্তমানে গুরুতর সংকটের মুখোমুখি:

 * অবৈধ দখল ও ভরাট: কক্সবাজার শহর সংলগ্ন নদী তীর ও প্যারাবন কেটে যত্রতত্র আবাসন এবং বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণের ফলে নদীর প্রবাহ সংকুচিত হয়ে নৌপথ ব্যাহত হচ্ছে।

 * পলি জমা ও নাব্যতাহ্রাস: পাহাড়ি ঢলের সাথে আসা পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে নদীতে পানি কমে যায়; পক্ষান্তরে বর্ষায় উজান থেকে আসা পানিতে প্রতি বছর নদী উপচে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি হয়।

 * বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ: শহর ও বাণিজ্যিক বাজারের অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলার ফলে নদীর ইকোসিস্টেম ও মৎস্য প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।



৫. উপসংহার: বাঁকখালি কেবল একটি নদীর নাম নয়; এটি বান্দরবানের পাহাড়ি নিস্তব্ধতা থেকে শুরু করে কক্সবাজারের পর্যটন ও বাণিজ্যিক নগরীকে এক সুতোয় বাঁধা এক জীবন্ত ধমনী। নাইক্ষ্যংছড়ির পাহাড়, রামুর শস্যশ্যামল প্রান্তর এবং কক্সবাজারের সমুদ্রমুখী বাণিজ্য— সবকিছুর পেছনেই রয়েছে বাঁকখালির অবদান। বাঁকখালি নদী রক্ষা পাওয়ার উপর কক্সবাজার ও বান্দরবানের পরিবেশগত ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। নদীটির নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে নিয়মিত ড্রেজিং, উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে অবৈধ দখল মুক্ত করা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাঁকখালিকে বাঁচিয়ে রাখা এখন এই জনপদের সবচেয়ে বড় দাবি।

[লেখক পরিচিতি: মং হ্লা প্রু পিন্টু অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক; লেখক ও গবেষক; সমাজ ও সংস্কৃতিকর্মী]

কোন মন্তব্য নেই: